আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কেন্দ্রস্থলে একটি মালবাহী ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীবাহী পাবলিক বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন নিহত এবং আরও ২৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
শনিবার (১৬ মে, ২০২৬) বিকেলে ব্যাংককের একটি বিমানবন্দর রেল লিঙ্ক স্টেশনের কাছে অশোক-দিন ডায়েং রোডের একটি ব্যস্ত রেলক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। থাই গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স, এপি ও আল-জাজিরার বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ব্যাংকক থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি টনি চেং জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে।
ব্যারিয়ারে আটকা: যাত্রীবাহী বাসটি রেললাইন পার হওয়ার সময় হঠাৎ স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যারিয়ার নেমে আসে, যার ফলে বাসটি লাইনের ওপরই আটকা পড়ে।
ধাক্কা ও বিস্ফোরণ: ঠিক সেই মুহূর্তেই দ্রুতগতির মালবাহী ট্রেনটি এসে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দেয় এবং বেশ কিছু দূর হিঁচড়ে নিয়ে যায়। ট্রেনের ধাক্কায় বাসটি দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার পরপরই এটিতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণসহ আগুন ধরে যায়।
আগুন ছড়িয়ে পড়া: বাসের আগুন দ্রুত আশেপাশে থাকা অন্যান্য গাড়ি ও মোটরসাইকেলেও ছড়িয়ে পড়ে এবং কালো ধোঁয়ায় চারপাশ ছেয়ে যায়।
ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে হতাহতদের বের করে আনে। আহত ২৫ জনকে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। থাই সংবাদমাধ্যম ‘খাওসোদ ইংলিশ’ জানিয়েছে, মালবাহী ট্রেনটি দক্ষিণাঞ্চলীয় চাচোয়েংসাও প্রদেশ থেকে ব্যাংককের ব্যাং সু ডিস্ট্রিক্টের দিকে যাচ্ছিল।
ব্যাংককের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডের (তৎকালীন সিয়াম) রেলওয়ে ও নগরায়নের ইতিহাসের এক দীর্ঘ বিবর্তন এবং জরাজীর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকটকে ফুটিয়ে তোলে।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও রয়েল থাই রেলওয়ে (১৯০০-১৯৪৭): ১৯০০ সালের দিকে থাইল্যান্ডের রাজা চুলালংকর্ন (Rama V) দেশের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় রেলওয়ে ব্যবস্থার সূচনা করেন। ১৯০০ সালের সেই শুরুর দিকে ট্রেন ছিল প্রধান এবং সবচেয়ে নিরাপদ দূরপাল্লার পরিবহন। ১৯০০ সালের সেই প্রাচীন রেললাইনের ওপর ভিত্তি করেই আজকের মেগাসিটি ব্যাংককের আধুনিক ট্রাফিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা এখন ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
নগরায়নের চাপ ও ক্রসিং জটিলতা (১৯৮০-২০১০): আশির দশকের পর ব্যাংকক দ্রুত একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফলে ১৯০০ সালের তৈরি রেললাইনের ওপর অসংখ্য সড়ক ও ব্যস্ত ক্রসিং নির্মিত হয়। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং বা ব্যারিয়ার ব্যবস্থা আধুনিক করা হলেও, জরাজীর্ণ ট্র্যাক এবং বাসের মতো ভারী পরিবহনের বিশৃঙ্খলার কারণে এই ক্রসিংগুলো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ২০২৬-এর বাস্তবতা: ২০২৪ সালের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পর্যটন ও দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনের (যেমন চীন-থাইল্যান্ড হাই-স্পিড রেলওয়ে) জোয়ার এলেও অভ্যন্তরীণ সাধারণ রেলের নিরাপত্তা অবহেলিতই রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের এই জানুয়ারিতেও ব্যাংককে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের ওপর নির্মাণাধীন ক্রেন ভেঙে পড়ে ২৮ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০২৬ সালের মে মাসের এই দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, কেবল আধুনিক শপিংমল বা স্কাইট্রেন নয়, বরং একদম সাধারণ লেভেল ক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা কতটা জরুরি।
ইতিহাস সাক্ষী, দ্রুত নগরায়নের সাথে সাথে যদি গণপরিবহন ও ট্রাফিক শৃঙ্খলার আধুনিকায়ন না হয়, তবে এই ধরণের মানবিক বিপর্যয় এড়ানো অসম্ভব। ১৯০০ সালের সেই রাজকীয় সিয়ামের রেলওয়ে থেকে ২০২৬ সালের এই আধুনিক ব্যাংকক—পরিবহনের গতি বাড়লেও নিরাপত্তার প্রাচীন জরাজীর্ণ রূপটি বদলায়নি। স্বয়ংক্রিয় ব্যারিয়ার নেমে আসার পর বাসটি কেন লাইনের ওপর আটকে গেল—তা ২০২৬ সালের আধুনিক সিগন্যালিং ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। থাই সরকারের উচিত হবে দ্রুতগতির প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত এই ক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা ঢেলে সাজানো।
সূত্র: ১. ব্যাংককের অশোক-দিন ডায়েং রোড দুর্ঘটনাস্থল থেকে আল-জাজিরা ও রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদন (১৬ মে, ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীতে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় রেলওয়ের বিবর্তন ও লেভেল ক্রসিং নিরাপত্তা বিধি (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |